ঊন-মুহূর্ত

আমাদের জীবনের পথটা সবসময় একটা মুহূর্তের মুখে এসে বাঁক নেয়। সেই বাঁকে আমরা কিছুক্ষনের জন্যে দাঁড়িয়ে, নিজের সঙ্গে কথা বলে আবার এগিয়ে যাই। আসলে আমাদের এই পথ চলাটা এতই দ্রুত যে, সেই ক্ষণিকের মুহূর্তটা কে আমরা ভুলে যাই; অথচ সেই মুহূর্তে নিজের সঙ্গে বলা কথাটা আমাদের জীবনের চলাটা কে দিক দেখায়।
অফিসের কাজে শিলচর গেছিলাম। কলকাতা ফেরার ফ্লাইটে টিকিট পাইনি বলে, গৌহাটি হয়ে কলকাতা ফিরব ঠিক করলাম। সেই মত শিলচরের আই-এস-বি-টি থেকে বাসে চেপে হাইওয়ের গর্ত, ধুলো আর জ্যাম পেরিয়ে আমার যাত্রা শুরু হল। অচেনা জায়গায় জার্নি করার সুবিধে হল, কেউ চিনতে পারেনা, তাই নিজের মত সময় কাটানো যায়। রাস্তার ধারে একটা ধাবায় রাতের খাওয়ার খেয়ে বাসের সিটে একটু ঘুমনোর চেষ্টা করে পারলাম না। তাই ফেসবুক-টুইটারে পরিচিত কিছু মানুষের সঙ্গে টুকটাক আলোচনা করে সময় কাটানোর চেষ্টা করলাম। এভাবেই কখন আসাম রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে মেঘালয় রাজ্যে ঢুকে গেলাম, খেয়াল করিনি। অন্ধকার বাসের মধ্যে মোবাইল স্ক্রিনের আলো আমার মুখজ্বল করলেও, নেটওয়ার্ক না থাকায় মুডটা অফ হয়ে গেল। কিছুটা বাধ্য হয়েই, মোবাইল বন্ধ করে বাইরে তাকালাম।
moon-2
আকাশে সেদিন চাঁদটা গোল ছিল। পূর্ণিমা না হলেও, চতুর্দশী কিম্বা প্রতিপদ ছিল বোধহয়। বাসটা তখন পাহাড়ের গা দিয়ে এঁকে-বেঁকে এগচ্ছিল। বাসের জানলা দিয়ে যত দূর চোখ যায়, শুধু ঘন জঙ্গল। কাল কালিতে আঁকা জঙ্গল, যার ওপর চাঁদের দুধ সাদা আলোর একটা প্রলেপ লাগানো হয়েছে যেন। ছবিটা দেখে মনটা ভরে গেল। আমাদের প্রকৃতি আমাদের কত কিছু দিয়েছে। আমরা সেটা দেখি না, বোঝার চেষ্টা করি না। অথচ, আমরা নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান আর বিজ্ঞ প্রাণী বলে দাবি করি।
সেই মুহূর্তে আমি নিজের সঙ্গে কথা বললাম। আমার কি চাই? এই পৃথিবীতে যা পেয়েছি অথবা পেতে চলেছি, এই প্রকৃতিই তো সেটা ধার্য করে রেখেছে। তার চেয়ে বেশী অথবা কম কিছুই আমি পাবনা। এই মাপ শুধু আমার জন্য নয়, এই পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের জন্য ধার্য। যুগ-যুগান্তঃ ধরে এই হিসেবে কাজ হচ্ছে, এক দিনের জন্যেও এই হিসেবে কোন বিচ্যুতি হয়নি। কি করে এটা সম্ভব? কে এই হিসেব রাখে? তাঁর নামই কি চিত্রগুপ্ত? না অন্য কিছু? তাঁর নাম যাই হোক না কেন, তাঁর মত ধীর-স্থির এবং নিখুঁত আর কেউ নেই। সব কিছুই একটা নিয়মে বেঁধে রাখা এবং নিরন্তর চালনা করা যে কি কষ্টকর, আমার কাজের সূত্রে আমি খুব ভাল করেই জানি। তাই রাতের ঐ বাসের যাত্রায়, হঠাৎ নিজেকে বড্ড অগোছালো বলে মনে হল।
খেয়াল হল, এত এক নিরন্তর যাত্রা। সেই আদি থেকে ঐ অনন্ত অবধি সবই তো ঠিক সুরে বাধাঁ হয়েই আছে। তবু আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়ে এই যাত্রাপথে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে; এই নিরন্তর যাত্রাকে আমার সঙ্গে জরিয়ে থাকা প্রত্যেকের জন্যে সুখময় করাটাই আমার দায়িত্ব। আর তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে, নিজেকে সুখি রাখার চাবিকাঠি।
অথচ, আমি নিজের সেই দায়িত্বটাই ভুলে গিয়ে, এই নিরন্তর যাত্রাটা কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে চলেছি, যার জন্য কোন যোগ্যতাই আমার নেই। তাইতো আমার সব কিছুই এত অগোছালো হয়ে আছে। ঠিক করলাম, অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেছে, এবার নিজেকে গোছাতে হবে। আমিতো এটাও জানি না যে কোনদিন হঠাৎ আমার এই নিরন্তর যাত্রার সঙ্গে যোগাযোগ শেষ হয়ে যাবে।
#life #lesson #truth #জীবন #শিক্ষা #সত্য
Advertisements