দেখা।।

ঘুম থেকে উঠেই আয়নার সামনে দাঁড়ানোটা আমার অনেক দিনের পুরনো অভ্যেস। তাই অভ্যেসবশতঃই আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘুম জড়ানো চোখে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবিটা দেখে চমকে উঠলাম। আয়নায় নিজেকে দেখতেই অভ্যস্ত আমি, কিন্তু এ’তো রোজ সকালে দেখা আমি নই। ইনি আমার মতই দেখতে একটা মানুষ। ইনি এখানে এলেন কি করে? কি জন্যে এসেছেন?

আয়নার ভেতরের লোকটা বোধহয় আমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারল, তাই একটা মুচকি হাসি দিল। তারপর বলল, “চিনতে পারছ আমায়?” আমি মাথা নাড়ালাম। লোকটা হাসল, তারপর বলল, “জানি, তুমি আমায় চেনোনা। আর, চিনতে চেষ্টাও কোরোনা। পারবে না।” Reflection-296x300

মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা বেয়াদব তো লোকটা! সকাল সকাল মস্করা করছে!?! তারপর ভাবলাম, এখনও বোধহয় ঘুম ভাঙ্গেনি আমার। একটা স্বপ্ন দেখছি। এই কথাটাও লোকটা বুঝে ফেলল। আর তাই সে খুব জোরে হেসে উঠল। তারপর, হাসি থামতে বলল, “তুমি জেগেই আছ। আর এটা স্বপ্নও নয়, বাস্তবেই আজ আমি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু তুমি আমায় চিনতে পারলে না, পারবে না।”

আমি হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে লোকাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি মনে মনে বললাম, ‘আশ্চর্য’, এই লোকটা কি অন্তর্যামী? নইলে, আমার মনের কথা বুঝে ফেলছে কি করে? এই কথাটাও লোকটা বুঝে ফেলল। একটু হেসে বলল, “এটা একটা মজার খেলা। তুমি আমায় এক্কেবারে চেন না, আর আমি তোমায় খুব ভাল করে চিনি। বলতে পার, তোমায় আমি হাড়েহাড়ে চিনি।” আমি এই কথাটার কোন মানে খুজে পাওয়ার আগেই সে আবার বলল, “অত গুলিয়ে ফেল না। ব্যাপারটা খুব সোজা। আমি তোমার সব কথা জানি। তোমার পছন্দ-অপছন্দ জানি। তোমার সুখদুঃখের খবরও আমার অজানা নয়। তাছাড়া, তোমার মনের ওই গোপন কোণে যে কথাগুলো লুকিয়ে রেখেছ, আর জোর করে চেষ্টা করছ মেনে নেওয়ার যে ওই ঘটনাগুলো কোনদিন ঘটাওনি; সেই কথাগুলোও আমার জানা আছে।”

এটা শোনার পর, আমার ভয় করতে লাগল। এই লোকটা কে? কি করে এত কথা জানে সে আমার ব্যাপারে? কোথা থেকে খবর পেল? কে খবরগুলো দিল?

খুব স্বাভাবিক ভাবেই, আমার এই চিন্তাটাও সে বুঝে ফেলল। এবার একটু গম্ভীর গলায় বলল, “তোমার কথা আমায় অন্য কোথাও থেকে জানতে হয়না। তোমার কাছে থেকেই জানতে পারি।” আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘মানে’?

“মানে বোঝা তোমার কম্ম নয়”, লোকটা এবার বেশ ঝাঁজালো গলায় বলে উঠল “আমরা সেই কবে থেকে এক সঙ্গে আছি অথচ তুমি এখনও আমায় চেন না, এটা যত না দুঃখের তাঁর চেয়েও বেশি অপমানজনক। তুমি প্রতি পদে আমায় অপমান করেছ। তুমি নিজের শরীরকে যত্ন করেছ, নিজের চারপাশের সবকিছুই যাতে খুব ভাল হয় সে ব্যাপারে যত্নশীল হয়েছ, কিন্তু আমার কথা ভাবনি। তাই আমি ঠিক করেছি, তোমার কাছে প্রতিমুহূর্তের এই অপমান আমি আর সহ্য করবনা। আজ তোমায় শেষ করে, ওই অপমানগুলোর প্রতিশোধ আমি নেব।” কথাগুলো বলেই লোকটা খুব জোরে হেসে উঠল। তার হাসির জোরে আমার সামনের আয়নাটাও একটু কেঁপে উঠল। খুব ইচ্ছে করছে, আয়নার সামনে থেকে সরে যাওয়ার, কিন্তু পা নাড়তে পারছি না। মাথাটা ভোঁভোঁ করছে। আয়নার ভেতর থেকে লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হেসেই চলেছে।

ওই লোকটা – মানে আমি – মানে আমার মতই দেখতে আমি, কিন্তু সে আমি নই। মাথার ভেতরে সব যুক্তিগুলো কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। আমার পরিচিতরা আমাকে ঠাণ্ডা মাথার বুদ্ধিমান মানুষ বলে আর তাই নিয়ে নিজের ওপর আমার একটু অহংকারও ছিল, কিন্তু এই লোকটার সামনে এসে সেই অহংকারটাও চুরমার হয়ে গেল দেখছি। মনে মনে এবার রাগতে শুরু করলাম। এটা কি ধরনের ইয়ার্কি? আমি, আমার নিজের সামনে দাঁড়িয়ে, আমাকেই ধমকাচ্ছি। কে এই ইয়ার্কি করছে? কেন করছে? কি করে এই সমস্যা থেকে বেরনো যায়? কিছু একটা উপায়’তো নিশ্চয়ই আছে।

আয়নার ভেতরের লোকটা, এই কথাগুলোও বুঝে ফেলল। একটা বাঁকা হাসি মুখে এনে বলল, “কোন ফন্দি-ফিকিরে তোমার নিসকৃতি নেই। তুমি মনের মধ্যে যে ফন্দি ভাঁজ না কেন, আমি সেটা ঠিক জেনে যাব; অথচ আমার মনের ফন্দি গুলো তুমি জানতেই পারবে না। তাই তোমার কোন চালই  আজ তোমায় আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না।”

নিজেকে এখন বড় অসহায় লাগছে। আমি যাই ভাবি না কেন, আয়নার ভেতরে দাঁড়ানো লোকটার কাছে সেটা অজানা নয়। এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে লোকটা আমায় দেখছে, নিজেকে উলঙ্গ মনে হল। আমি বুঝতে পারছি, আমি ভাবতে চাইছি, কিন্তু ভেবে উঠতে পারছিনা। না, এভাবে তো আমি সত্যি শেষ হয়ে যাব।

হঠাৎ খেয়াল করলাম চোখের সামনে সবকিছুই ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে, শুধু ওই আয়নার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার হা-হা করে হাসিটাই চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে।

Advertisements