বাংলা ভাষা দিবসে কিছু মনের কথা…

২১ ফেব্রুয়ারী, বাংলা ভাষা দিবস। আজ নানান্ জায়গায় বাংলা ভাষা নিয়ে অনেক উৎসব হবে। কিন্তু আমার মনে একটা ক্ষোভ জমে আছে, জানি না সেটাকে কতটা ভাষা দিতে পারবো; তবে চেষ্টা করছি।


3. bangla_862

বাঙালীরা ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনীতিতে এক অন্যন্য এক প্রজাতি। এই নিয়ে আমাদের, মানে বাঙালীদের গৌরবও কম নেই। প্রাক-স্বাধীনতা যুগে অবিভক্ত বাংলার কেন্দ্রবিন্দু কলকাতা জুড়ে গড়ে উঠেছিল আধুনিক বাঙালীর জাতীয়তাবোধ, যা ছড়িয়ে গেছিল গোটা দেশে। বাঙালীর কাঁধে ভর করেই শুরু হয়েছিল ভারতের স্বাধীনতার লড়াই। কিন্তু বাংলার জয় হল না। দেশ স্বাধীন হলেও, বাংলাও ভাগ হয়ে গেল। সময়ের পাখায় ভর করে এই বাংলার ভাষা আর সংস্কৃতিও বদলে যেতে লাগলো। এই বাংলার বুকে শুরু হল ভারতের তথাকথিত রাষ্ট্র ভাষা হিন্দির প্রভাব। হিন্দিকেই আমাদের প্রাণের ভাষা হিসেবে মেনে নিলাম। আমরা দিনে-দিনে আমাদের বাঙালিত্ব হারিয়ে ভারতীয় হয়ে ওঠার নেশায় মেতে উঠলাম। বাংলায় কথা বলার মাঝেই হিন্দিতে ‘ক্যায়া বাত হ্যায়’ বলে উঠতে লাগলাম। বাংলা সিনেমায় হিন্দি গানের ব্যবহার মেনে নিলাম। টেলিভিশনের নাচ-গানের অনুষ্ঠানে হিন্দি গানের রমরমা মেনে নিলাম। আমাদের আটপৌরে মুখের কথার সঙ্গে কিছু হিন্দি, কিছু ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে এক খিচুড়ি ভাষার ব্যবহার মেনে নিলাম। এই খিচুড়ি ভাষাকে জায়গা দিয়ে, বাংলা ভাষার বিকার মেনে নিলাম। কিন্তু এর পর? আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে বিকৃত করার প্রবণতা যদি চলতেই থাকে তাহলে আমরা ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে আমরা, বাঙালীরা, দূরে সরে যাব।

আমরা বাঙালী, তাই আমরাই আমাদের মাতৃভাষার ধারা কে আগামী প্রজন্মের হাতে দিয়ে যাব। তবে কেন আমরা আমাদের বাঙালিসত্ত্বার অপমান করছি? নিজেদের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ দিচ্ছি? কেন আমরা বাংলার বদলে হিন্দি ভাষার দিকে ঝুঁকছি? কেন বাড়ির মা-বোনেরা ‘দিয়া আউর বাতি’ –র মত টিভি ধারাবাহিকে আসক্ত হচ্ছে? কেন মায়েরা তাদের বাচ্চাদের হিন্দি কার্টুন ‘ছোটা ভীম’ দেখিয়ে দুপুরে ভাত খাওয়ার অভ্যাস করাচ্ছে? কেন বাংলার ‘ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর’ হচ্ছে মুম্বাইয়ের শাহরুখ খান? আমাদের বাঙালী বিয়েতে ‘মেহেন্দি’ করা হচ্ছে? বাসর ঘরের বদলে, হিন্দি সিনেমার ধাঁচে গানের জলসা হচ্ছে?

আমার প্রশ্ন শেষ হবে না। আমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে যুক্তিও হয়ত দেওয়া যাবে, কিন্তু আমার এই লেখার আসল উদ্দেশ্যটাই হল, আমাদের প্রজন্মের সামনে আয়না রেখে, একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাধ্য করা- কেন বাঙালী দিনকে-দিন দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে? যদি এখনও বাঙালীর মধ্যে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা না জাগে; যদি বাঙালী নিজের ‘বাঙ্গালিয়ানা’ অলঙ্কারের মর্যাদা দিতে না পারে- হয়ত সেই দিন আর খুব বেশ দূরে নেই, যেদিন বাঙ্গালির ভাষা, সংস্কৃতি ও গৌরব চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে।

আজ আরেক বার একটা ভাষা আন্দোলন জেগে উঠুক- যা রক্ত ঝরাবে না কিন্তু বাঙালীকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গর্বিত করে তুলবে।


“হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন, তা সবে (অবোধ আমি) অবহেলা করি;
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।
পালিলাম আজ্ঞা সুখে পাইলাম কালে, মাতৃ-ভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণি জালে।”
– মাইকেল মধুসূদন দত্ত
Advertisements