হালফিলের এক নতুন রোগ সম্পর্কে কিছু কথা।

dance_of_youth

সাম্প্রতিক আমাদের দেশের কিছু মানুষ এক ভয়ঙ্কর রোগে ভুগতে শুরু করছেন। এই রোগটা ঠিক তখনই হয়, যখন কিছু মানুষ আর্থিক এবং ক্ষমতার গণ্ডির মধ্যে হঠাৎ করে একটু প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। এই রোগীদের চিহ্নিত করার জন্যে তিনটি লক্ষন আছেঃ-

১) এরা ভাবেন, এরাই শ্রেষ্ঠ,

২) এরা ভাবেন, এরাই সর্বজ্ঞ,

৩) এরা ভাবেন, এরাই সর্বদা নির্ভুল।

এই নামহীন ভয়ঙ্কর রোগটায় কিছুদিন ভুগলেই, মানুষ নিজেদের ঈশ্বরসম অথবা বলা ভাল- ঈশ্বর-ই ভাবতে শুরু করেন। এনারা নিজেদের চারপাশের মানুষদের তাঁর ক্রিতদাশ বলে মনে করেন। নিজেদের প্রত্যেকটা কথা এবং প্রতিটা কাজকে প্রকৃতির একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী হন। আর যারা এনাদের প্রশ্ন করেন, বিরোধিতা করেন; তাদের কে এনারা পৃথিবীর নিকৃষ্টতম কীট মনে করে, কড়া কীটনাশক দিয়ে নিশ্চিহ্ন করতেও দেরি করেননা। এই রোগীরা নিজেদের সম্পর্কে তৈরি (ভ্রান্ত) ধারনার প্রভাবে যেনতেন প্রকারেণ আমাদের সম্পর্ক, সমাজ ও সময়—প্রত্যেকটা বিষয়ে পরিবর্তন আনতে চান।

এই রোগের আসল শিকড়টা অবশ্য হল – অশিক্ষা, অথবা আরও ভাল করে বললে ‘অর্ধশিক্ষা’। এমনিতেই আমাদের এই পোড়া দেশে ‘শিক্ষা’-ই সবচেয়ে অবহেলায় থাকে। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজের নেতা – প্রনেতা, সবাই, সবসময়, প্রায় সবকিছু নিয়েই উদবিঘ্ন- একমাত্র শিক্ষার ব্যাপারটা ছাড়া।

আসলে, শিক্ষা মানুষকে দেখতে শেখায়, ভাবতে শেখায়, ভাল-মন্দের বিচার  করতে শেখায়। নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে শেখায়। তাই, এই শিক্ষার মূল জায়গাটাকেই উপেক্ষিত, অবহেলিত রাখা হয়েছে। আগে শিক্ষার অধিকার আমাদের সমাজের কিছু বিশিষ্ট মানুষদেরই প্রাপ্য ছিল; সময়ের সাথে সেই গণ্ডি নষ্ট হয়ে গেলেও- আমাদের সমাজের নীতিনির্ধারকেরা খুব সুকৌশলে, ছক করে, অঙ্ক কষে, শিক্ষার প্রসারকে কুক্ষিগত করেই রেখেছিল। আজও কিন্তু সেই পরিশ্স্থিতি বদলায়নি। আসল সত্যিটা হল- শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা যত কম থাকবে, এই নীতিনির্ধারক-দের তত কম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।

আমাদের চারপাশে অবশ্য শিক্ষার প্রসার এবং অশিক্ষিতদের শিক্ষিত করার একটা নাটক বেশ রমরমিয়েই চলছে। হালফিলে, এই প্রচেস্থায় এক বিশেষ শ্রেণীর মানুষ, যাদের জীবনের একমাত্র ধ্যান-ধর্মই হল সমাজসেবা ও দেশসেবা- তারা শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়াতে পরীক্ষাকেন্দ্রে ছল ও বল, কোনকিছুর ব্যবহারকেই বাদ দিচ্ছেননা। যারা এদের এই ‘শিক্ষার প্রসার’ অভিযানে বাধা সৃষ্টি করেন, তাদেরকে এরা জানে মারতেও কসুর করেন না। অথচ, এরাই যদি নিজেদের ছল ও বলের কুশল ব্যবহারে, ছাত্রদের ঠিক করে ক্লাস করতে এবং নিয়মমেনে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করেন, তাহলেই আমাদের সমাজের মূল পরিকাঠামটা বদলে যেতে পারে। কিন্তু আমার এই ভাবনাটাই তো এক অলীক স্বপ্ন।

এই ‘শিক্ষা প্রসারের’ ধ্বজাধারিদের আসল উদ্দ্যেশ্য অবশ্য মানুষকে ‘শিক্ষিত’ করা নয়, বরং নিজেদের সেই বিদকুটে রোগের বীজ তাদের মগজে পুঁতে এক ‘চামচ’ জঙ্গল তৈরি করা, যেখানে নিজেদের ঈশ্বর ভাবার ভ্রান্ত ধারনাকে আরও বড় করে ভাবার ও পূজিত হওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। আর, তাই হয়ত আমাদের দেশের যে গুটিকয়েক শিক্ষাকেন্দ্রগুলি আজও কিছু মানুষকে সত্যি শিক্ষিত করতে ব্রতী, সেখানে নানান ছুতোয় এক অস্থিরতা তৈরি করে এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল পরিকাঠামকে নষ্ট করতে এরা তৎপর হয়েছে। উদ্দেশ্যতো সেই এক- মানুষ শিক্ষিত হবে, কিন্তু প্রশ্ন করার মানসিকতা শিখবেনা।

এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে থেকে আমরা নিজেকে মুক্ত করতে না পারলে; ওই ঈশ্বরভাবের ভ্রান্ত ভাবনায় নিমজ্জিত গোটাকয়েক মানুষের রোগমুক্তি না ঘটালে—আমাদের, আমাদের সমাজের এবং আমাদের দেশের বিনাশ হতে অবশ্য বেশী সময় লাগবেনা।

আমাদের ভাবতে হবে এবং প্রতিশেধক তৈরি করতে হবে। প্রত্যেকটি শিক্ষিত ও সুবুদ্ধিসম্পপন্ন মানুষই পারবেন এই রোগমুক্তি ঘটাতে।

Advertisements