বাংলা এবং বাঙালীর ইতিহাস

“আমরা ইতিহাস পড়ি, কিন্তু যে ইতিহাস দেশের জনপ্রবাহকে অবলম্বন করিয়া প্রস্তুত হইয়া উঠিয়াছে, যাহার নানা লক্ষণ, নানা স্মৃতি আমাদের ঘরে বাহিরে নানা স্থানে প্রতক্ষ্য হইয়া আছে, তাহা আমরা আলোচনা করি না বলিয়া ইতিহাস যে কী জিনিষ, তাহার উজ্জ্বল ধারনা আমাদের হইতে পারে না।”

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভুমিকা

সাধারণ বাঙালী তাঁদের সুপ্রাচীন ইতিহাস এবং ঐতিজ্য, এই দুইয়ের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না। আমার এই লেখা তাই ইতিহাসের পাতা উল্টে বাংলা এবং বাঙালীর সেই অস্তমিত ইতিহাসকে এক ঝলক দেখার নেওয়ার চেষ্টা। আমার এই লেখা পড়ে যদি একজন বাঙালীও নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হন, গর্ববোধ করেন, সেটাই হবে আমার সেরা পাওনা।

আমার লেখা শুরু হচ্ছে আদি-প্রস্তর যুগ, অর্থাৎ যখন পৃথিবীর বুকে হোমো সেপিয়েন্সরা হাঁটতে শুরু করেছিল এবং এই লেখা শেষ হবে, আধুনিক বাংলার ইতিহাস রচনা, অর্থাৎ বাংলা রেনেসাঁ যুগের প্রারম্ভিক মুহূর্তে।

বাংলার মাটি

আদি-প্রস্তর যুগের পাথরের হাতিয়ার
[ছবি কৃতজ্ঞতাঃ আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া]

আমাদের বাংলার উৎপত্তি আনুমানিক আজ থেকে প্রায় পঁচিশ লক্ষ বছর আগে হিমালয় পর্বত গঠনের শেষে প্লাইস্টোসিন যুগে। যদিও তখন আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ অথবা প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ বলে আলাদা কিছুই ছিল না, আদতে বাংলা নামের কিছুই ছিল না, কিন্তু এই মাটির অংশটুকু ছিল। তাই বলাই যায়, আজকের এই বাংলার ইতিহাস, যখন পৃথিবীতে হীমযুগ শেষ হয়ে, বিবর্তনের ধারা মেনে আধুনিক মানুষ, অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্সদের উৎপত্তি হচ্ছিলো, তখন থেকেই শুরু হয়েছে।

যদিও প্লাইস্টোসিন যুগের মানুষের কোনও কঙ্কাল ভারতবর্ষে এখনও পাওয়া যায়নি, তবে তারও আগের সময়, প্লায়োসিন যুগের কিছু জীবাশ্ম, অর্থাৎ হোমো ইরেক্টাসদের কঙ্কাল এশিয়ার তিনটে জায়গায় পাওয়া গেছে। এই জায়গাগুলো হল, আমাদের ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমের শিবালিক পর্বতমালা, চীনের চুংকিঙ অঞ্চল এবং ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপমালা। এই তিনটে অঞ্চলকে যদি একে অপরের সঙ্গে সরলরেখায় ধরার চেষ্টা করি, তাহলে একটা ত্রিভুজাকৃতি অঞ্চল তৈরি হয়, যার কেন্দ্র ভাগে থাকে আমাদের বাংলা। সুতরাং আমরা এমন ধারনা করতেই পারি যে প্লাইস্টোসিন যুগের আদি মানুষেরা আমাদের বাংলার মাটির ওপর দিয়েই যাতায়াত করত।

বাংলায় প্লাইস্টোসিন যুগের কোন মানব-কঙ্কাল না পাওয়া গেলেও, সেই সময় মানুষ যে এখানে বাস করত, তার প্রমাণ অবশ্য পাওয়া গেছে। বাঁকুড়ার শুশুনিয়া পাহাড় এবং মেদিনীপুর জেলায় ঝাড়গ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটি খুঁড়ে এমন কিছু পাথরের হাতিয়ার পাওয়া গেছে, যেগুলো প্লাইস্টোসিন যুগে তৈরি বলে প্রত্নতাত্বিকদের বিশ্বাস। এই হাতিয়ারগুলো দিয়ে হোমো স্যাপিয়েন্সরা নিজেদের আত্মরক্ষা এবং খাওয়ার জন্যে পশুদের শিকার করত বলেই বিশ্বাস করা হয়। কার্বন-ডেটিঙের হিসেবেও পাথরের এই হাতিয়ারগুলোকে প্রত্ন-প্রস্তর বা আদি-প্রস্তর যুগেরই বলা হয়েছে। অর্থাৎ আজকের এই বাংলার মাটিতে মানুষের বসবাস সেই আদি-প্রস্তর যুগ থেকেই।

পৃথিবীতে প্রত্ন-প্রস্তর বা আদি-প্রস্তর যুগ শেষ হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে এবং তারপর শুরু হয়েছিল নবপ্রস্তর যুগ।

আদিম বাঙালী

পৃথিবীর বুকে হোমো সেপিয়েন্সদের উৎপত্তির পর তাঁদের কাছে মূলত দুটো সমস্যা ছিল। প্রথমত, আত্মরক্ষা এবং দ্বিতীয় খাদ্যের যোগান। তবে হোমো সেপিয়েন্সরা যেহেতু পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীদের থেকে অনেক উন্নতমানের জীব ছিলেন, তাই তাঁরা নিজেদের জীবনসংগ্রামের সমাধানের জন্য আবিষ্কার করেছিলেন পাথরের তৈরি ‘আয়ুধ’ অথবা অস্ত্র। এই অস্ত্রের ব্যাবহার তাঁরা শুধু নিজেদের আত্মরক্ষা এবং পেটের খিদের তাগিদে পশু শিকারের জন্যেই করতেন।

প্রত্নোপলীয় যুগে হোমো সেপিয়েন্সরা আয়ুধ আবিষ্কার করা ছাড়াও আরও কিছু বৈশিষ্টের অধিকারী হয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ভাব বিনিময়ের জন্যে ভাষার ব্যবহার, পরিবারতন্ত্রের প্রবর্তন, মাটি দিয়ে পুতুল নির্মাণ, নিরাপত্তার জন্য গুহায় বসবাস, এবং গুহাচিত্রের মাধ্যমে নিজেদের শিকার ও ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকলাপের ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা। এই গুহাচিত্র গুলোই পৃথিবীতে ইতিহাস রচনার প্রথম পদক্ষেপ এবং আজ আমিও সেই পদক্ষেপকেই অনুসরণ করে চলেছি।

প্রত্নোপলীয় যুগের পর শুরু হয়েছিল নবপ্রস্তর বা নবোপলীয় যুগ। আধুনিক বাঙলার মাটিতে যে নবোপলীয় যুগে মানুষেরা বসবাস করতেন, তার প্রথম প্রমান পাওয়া যায় ১৯৭৮ সালে মেদিনীপুর জেলার শালবনি ব্লকের সিজুয়ায়। সেখানে একটা মানুষের করোটির জীবাশ্ম পাওয়া যায়। কার্বন ডেটিং করে সেটার আয়ু নির্ধারণ হয় প্রায় এগারো হাজার বছর, অর্থাৎ প্রত্নোপলীয় যুগের একদম শেষার্ধে বা নবোপলীয় যুগের প্রারম্ভিক সময়ে। দুর্ভাগ্যবশতঃ সেই সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ঔদাসিন্যে খননকার্য চালানো যায়নি।

নবোপলীয় যুগের বিশেষত্ব হল, সেই সময়ে মানুষ নিজেদের যাযাবর জীবন ত্যাগ করে গ্রামীণ জীবনের সূচনা করেছিলেন। তাঁরা জীবিকা হিসেবে পশুপালন এবং চাষবাসকে বেছে নিয়েছিলেন।

হুগলী জেলায় আরামবাগের হরাদিত্য গ্রামের একটা শস্যক্ষেতের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষকাষ্ঠ

সেই যুগের ধর্মীয় আচার সম্বন্ধে খুব বেশী জানা না গেলেও, তাঁরা যে প্রত্নপ্রস্তর-যুগের মানুষের মতই ঈশ্বর এবং ঐন্দ্রজালে বিশ্বাস করতেন, তার প্রমান পাওয়া যায়। নবোপলীয় যুগে মৃত ব্যক্তির সমাধির উপর একখানা লম্বা পাথরের ফলক আড়াআড়ি ভাবে পুঁতে দেওয়ার রীতি ছিল। এইরকম অনেক পাথরের ফলক এখনও মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, হুগলি জেলার বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। এইরকম পাথরের ফলককে স্থানীয় ভাষায় ‘বীরকাঁড়’ বা ‘বীরকল্লু’ বলা হয়, যার অর্থ হল ‘বীরপুরুষদের স্মৃতিফলক’। পরবর্তীকালে বাংলাদেশে মানুষের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পর গ্রামের বাইরে যে ‘বৃষকাষ্ঠ’ স্থাপন করার রীতি শুরু হয়, সেগুলো এই পাথরের প্রস্তরফলকের উত্তর-সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

নবোপলীয় যুগের অনেক কিছুই আজও আমাদের বাঙলা গ্রাম্য জীবনে দৈনন্দিন ব্যবহার হতে দেখি। যেমন ধামা, কুলো, চুবড়ি, ঝাঁপি, বাটনা বাটার জন্যে শিল-নোড়া অথবা শস্য পেষাইয়ের জন্যে জাঁতাকল ইত্যাদি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল আজও এই সমস্ত জিনিষগুলো আমরা সেই নবোপলীয় যুগের ‘টেকনোলজি’ ব্যবহার করেই তৈরি করি।

নবোপলীয় যুগের পর শুরু হয়েছিল তাম্র-প্রস্তর যুগ এবং এই তাম্র-প্রস্তর যুগেই গ্রামীণ সভ্যতার থেকে মানুষ নগরায়ণের দিকে পা বাড়ায়।

হোমো সেপিয়েন্সদের উৎপত্তি

ইন্দোনেশিয়া সুলাওয়েসিতে অবস্থিত লেয়াং-পেটটেকার গুহার ভেতরে প্লেইস্টোসিন যুগে আঁকা হাতের গুহাচিত্র
(ফটোগ্রাফারঃ- কাহিয়ো রামধনী)

মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে নানা নৃতাত্ত্বিক মতবাদ আছে। সেই মতে, মানুষ আর পৃথিবীর নর-বানরেরা (ওরাং ওটাং, গোরিলা, শিম্পাঞ্জি) বহু আগে একই পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। সেইদিক থেকে দেখলে, আধুনিক মানুষ, আধুনিক নর-বানরদের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, সরাসরি তাদের উত্তরসূরী নয়। বরং প্রাকৃতিক বিবর্তনের নিয়ম মেনেই ওরাং ওটাং, গরিলা কিম্বা শিম্পাঞ্জির মতই মানুষেরও উৎপত্তি হয়েছিল বহুদিন আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কোন এক প্রাইমেট থেকে।

আধুনিক ভূতাত্ত্বিক ধারনায় পৃথিবীর আনুমানিক বয়স প্রায় ৪৫৪ (±৫) কোটি বছর এবং তারও প্রায় ৪২০ কোটি বছর পরে পৃথিবীর বুকে প্রথম স্তন্যপায়ী জীবেদের আবির্ভাব ঘটে। আজ থেকে প্রায় ১৪০ কোটি বছর আগে, সেই স্তন্যপায়ী জীবেদের মধ্যেই কোন এক প্রাইমেট থেকে ওরাং ওটাং প্রজাতির সৃষ্টি হয়। তারপর আনুমানিক প্রায় ৫০ লক্ষ বছর পর গরিলা প্রজাতির সৃষ্টি হয়। তারও প্রায় ৩০ লক্ষ বছর পর সেই প্রাইমেটদেরই একটা অংশ বিবর্তিত হয়ে হোমিনিন, অর্থাৎ মানুষ এবং আরেকটা অংশ বিবর্তিত হয়ে শিম্পাঞ্জি প্রজাতির উৎপত্তি ঘটায়। এরপরই কোন এক অজ্ঞাত কারণে সেই প্রাইমেটরা পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এখানে যে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না সেগুলো হল- ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৭ কোটি বছর আগে, পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডাইনোসরদের জীবাশ্ম পাওয়া গেলেও মাত্র ৭০ লক্ষ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া আমাদের আদিম পূর্বপুরুষ সেই প্রাইমেটদের কোন জীবাস্ম আজও কেন পাওয়া গেল না? তাহলে কি তাঁরা এই পৃথিবীর বাসিন্দা ছিলেন না? এই প্রশ্নগুলোর কোন সঠিক উত্তর কোনোদিন নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

প্রাচীন জীবাশ্ম প্রমাণ থেকে ধারনা করা হয় হোমিনিন বংশের প্রথম সদস্য ছিল স্যালেনথ্রোপাস টিচডেনেসিস প্রজাতির প্রাণীরা, যারা পৃথিবীর বুকে প্রথম বাইপেডাল অর্থাৎ নিজেদের দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং চলাফেরা করত। এছাড়াও অর্রোরিন টিউগেনেসিস এবং আর্দিপীথেকাস কাদাব্বা নামের কিছু প্রজাতিকেও হোমিনিন বংশের বাইপেডিক বলা হয়, কিন্তু সেই সমস্ত দাবীর সপক্ষে একমাত্র আফ্রিকান হোমোনয়েডিয়ার (এপস) হওয়া ছাড়া আর কোন জোরালো তথ্যপ্রমান এখনও পাওয়া যায়নি।

বাইপেডালিজম ছিল হোমিনিনদের মধ্যে ঘটে যাওয়া একমাত্র মৌলিক অভিযোজন, যা তাদের সমকালীন বিবর্তিত শিম্পাঞ্জিদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। বাইপেডালিজমের ফলে হোমিনিনদের কঙ্কালের মধ্যেও একটা পরিবর্তন আসে। তারা স্বাধীনভাবে নানারকম জিনিষপত্রকে ধরতে, তুলতে এবং বহন করতে সক্ষম হয়। দু’পায়ে হাঁটার ফলেই তারা সূর্যের রশ্মিতে সৃষ্ট হাইপারথারমিয়া কে এড়িয়ে, শারীরিক শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়। ফলে তারা অনেকটা ক্ষেত্রফল জুড়ে ঘুরে বেড়াতে, শিকার করতেও সক্ষম হয়।

আজ থেকে প্রায় ৪০ লক্ষ বছর আগে, অর্থাৎ প্লাইওসিন যুগের শেষের দিকে, বাইপেডাল হোমিনিনদের মধ্যে বিবর্তন ঘটে অস্ট্রালোপিথেকাস প্রজাতির উৎপত্তি হয়। তারাই প্রথম নিজেদের আত্মরক্ষা এবং খাদ্যের যোগানের জন্য পাথরের অস্ত্র নির্মাণ করা শুরু করে।

প্লেইস্টোসিন যুগে প্রথম দিকে, অর্থাৎ আনুমানিক ২৫ লক্ষ বছর আগে, এই অস্ট্রালোপিথেকাস প্রজাতির মধ্যে মস্তিষ্কের আকার, শারীরিক কাঠামো, প্রজনন প্রক্রিয়া এবং মানসিক আচরণের বিবর্তন হয়ে প্রথমে হোমো হ্যাবিলিস এবং তারপর হোমো ইরেক্টাস প্রজাতির সৃষ্টি হয়। প্রায় ১৯ লক্ষ বছর আগে উদ্ভূত হোমো ইরেক্টাস প্রজাতির মানুষেরাই পাথরে অস্ত্র ছাড়ও চাকা তৈরি করে, আগুনের ব্যবহার শুরু করে, কাঁচা খাওয়ার বদলে রান্না করে খাওয়া শুরু করে এবং যাযাবর জীবনের পত্তন ঘটায়।

পৃথিবীর বুকে পাওয়া বিভিন্ন জীবাশ্মের আয়ু বিচার করে বিলুপ্ত প্রাইমেট থেকে শুরু করে হোমো ইরেক্টাস উৎপত্তির কেন্দ্রস্থল আফ্রিকা মহাদেশের আধুনা ইথিওপিয়া এবং কেনিয়া দেশের বিভিন্ন জায়গাকেই বিবেচনা করা হয়। তারপর সম্ভবত নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি এবং তার ফলে উদ্ভূত খাদ্য সমস্যার সমাধানের জন্যে তারা ক্রমশ উত্তর দিকে আধুনা আলজিরিয়া – মরক্কো এবং দক্ষিণে মোজাম্বিক – সাউথ আফ্রিকার দিকে ছড়িয়ে পরে। ধারনা করা হয়, আনুমানিক ১৭ লক্ষ বছর আগে, এই হোমো ইরেক্টাসদের কয়েকটা দল  ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এরা ছিল মাঝারি উচ্চতার মানুষ এবং দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটতে পারতো। এদের মস্তিষ্কের খুলিটা নিচু কপাল পেছনের দিকে হেলানো এবং নাক, চোয়াল ও তালু চওড়া হত। আধুনিক মানুষের তুলনায় তাদের মস্তিষ্কের আয়তন কম হলেও, দাঁত বেশ লম্বা হত।

আনুমানিক ৭০ হাজার বছর আগে হোমো ইরেক্টাসরা, হোমো নিয়েন্ডারথালস, হোমো ফ্লোরেসিয়েন্সিস এবং হোমো ইডাল্তু হিসেবে বিবর্তিত হয়। জিন গত সমস্যার জন্যে হোমো নিয়েন্ডারথালসরা প্রায় ২৪ হাজার বছর আগে এবং হোমো ফ্লোরেসিয়েন্সিসরা ১২ হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও, হোমো ইডাল্তুরা টিকে যায়। এই হোমো ইডাল্তুরা নিজেদের শরীর ঢাকার জন্যে পশুদের চামড়ার ব্যবহার শুরুর করে। সেই অর্থে, এরাই আধুনিক মানুষের জন্যে ফ্যাশান ট্রেন্ড শুরু করেছিল। এরাই ছবি আঁকা, গান গাওয়ার মত সংস্কৃতিক প্রথারও প্রবর্তন করেছিল।

এই হোমো ইডাল্তুরাই বিবর্তিত হয়ে আনুমানিক ১০ হাজার বছর আগে আজকের হোমো সেপিয়েন্সে পরিনিত হয়েছে। হোমো সেপিয়েন্সদের উৎপত্তির সঙ্গেই প্লেইস্টোসিন যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে।

১৯৭৮ সালে মেদিনীপুরের সিজুয়ায় পাওয়া প্রায় ১১ হাজার বছরের পুরনো মানুষের করোটি প্রমান করে আধুনা বাঙলার মাটিতেও আদিম মানুষের জীবনযাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই অর্থে আমরা গর্ব করতেই পারি আমাদের বাঙলার ইতিহাস, পৃথিবীর সুপ্রাচীন ইতিহাসের সমকালীন।

এখানে আমি ইচ্ছে করেই মানব প্রজাতির বিবর্তন ও অভিযোজন সম্পর্কে লিখলাম, তার কারণ বাঙলার ইতিহাসের সঙ্গে মানব-বিবর্তনের ধারা ওতপ্রোত ভাবে জরিয়ে আছে। এই ইতিহাস যে কোনভাবেই স্থানীয় নয়, তার প্রমান পরবর্তীতেই বোঝা যাবে।

মানব সভ্যতার উত্থান কাহিনী

প্লেইস্টোসিন যুগে হোমো ইরেক্টাসদের ভারতীয় ভূখণ্ডে আগমন এবং বিস্তৃতির একটা আনুমানিক মানচিত্র

ইতিহাসের খোঁজে বিভিন্ন জীবাশ্ম থেকে আমরা যা তথ্য পেয়েছি, দেখান থেকে আমরা পৃথিবীর আনুমানিক ৬০ কোটি বছরের ইতিহাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা তৈরি করতে পেরেছি। তার আগের পৃথিবীর ইতিহাস কেমন ছিল(?) সেই বিষয়ে আমরা আজও অজ্ঞ। মনে করা হয়, পৃথিবীর বুকে আনুমানিক ৩৫০ কোটি বছর আগে এককোষীয় প্রানের সঞ্চার হয়েছিল এবং ২৫ লক্ষ বছর আগে মানব প্রজাতির উৎপত্তি হয়েছিল। এরপর প্রায় ২৩ লক্ষ বছরের বিবর্তনের পর আনুমানিক ২ লক্ষ বছর আগে আধুনিক মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্সদের আবির্ভাব ঘটেছিল।

ভুতত্ববিদেরা বিশ্বাস করেন, মানব প্রজাতির আদিলগ্নে, মানুষেরা নিরামিষাশী ছিল। তারপর পৃথিবীতে তুষার যুগ শুরু হয়। আনুমানিক ১০ লক্ষ বছর আগে শুরু হয়ে ১০ হাজার বছর আগে সেই যুগের অবসান হয়। তুষার যুগে পৃথিবীর সমস্ত গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল বরফে ঢাকা পরে যায়, ফলে গাছ-পালা, ফল-মূল ইত্যাদির রসদে টান পরে। বাধ্য হয়েই মানুষ খাদ্য হিসেবে পশু শিকারে বাধ্য হয়। অথচ মানুষের দাঁতের সঙ্গে অন্যান্য বন্যপ্রাণীদের দাঁতের গঠনের মৌলিক পার্থক্য থাকায়, তারা পশুদের মত শিকারের শরীর খুব্লে খেতে পারত না। সেখান থেকেই মানুষ নিজেদের জন্যে প্রথম আবিষ্কার, পাথরের টুকরো দিয়ে আয়ুধ তৈরি করে। আগুনের ব্যবহার তখনও তাঁদের আজানা থাকায়, ধাতুর ব্যবহারও তাঁরা জানত না। প্রারম্ভিক আদি-প্রস্তর যুগের পাথরের অস্ত্রগুলোকে সুক্ষতার বিচারে শিল্পকর্ম হিসেবে মান্যতা না দেওয়া গেলেও, সেগুলো দিয়েই আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা নিজেদের জীবিত রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

মানব সভ্যতার ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়, মানব প্রজাতি যখনই কোন অসুবিধে বা বিপদের সম্মুখীন হয়েছে, তারা সমাধান হিসেবে নতুন কিছু আবিষ্কার করেছে। এভাবেই তারা জীব-জগতের অন্যন্য প্রাণীদের থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র এবং উন্নত প্রমান করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও পৃথিবীতে মানব প্রজাতির উন্নতি, একই সঙ্গে অথবা সমান তালে ঘটেনি; তবে এই উন্নয়নের পেছনে একটাই মোটিভ কাজ করেছে, নিজেদের নিরাপদ রাখা এবং জীবনচর্চায় স্বাচ্ছন্দ নিয়ে আসা।

মানব জাতির দ্বিতীয় আবিষ্কার হল, কৃত্রিম উপায়ে আগুন জালানোর ব্যাবস্থা করা। তারপর পাথরের অস্ত্র এবং আগুনের সাহায্যে আদিম মানুষেরা শুধু নিজেদের নিরাপদ জীবনযাপনই নিশ্চিত করেনি, বরং এই আবিষ্কার দুটোর সাহায্যে তাঁরা পৃথিবীর বুকে অন্যন্য জীবজন্তুদের ওপরে নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিল।

আদিম মানুষ পাথরের আয়ুধ এবং আগুনের ব্যবহার জানলেও তারা ধাতুর ব্যবহারে বহুদিন অজ্ঞ ছিল। হীম যুগের অবসানের প্রায় ৩০ হাজার বছর পর মানব প্রজাতি প্রথম ধাতুর অস্ত্র তৈরি করতে শেখে। এইজন্যেই পাথরের অস্ত্র আবিষ্কার থেকে ধাতুর অস্ত্র নির্মাণ শুরুর আগের সময়কাল কে আদি-প্রস্তর যুগ এবং তারপরের সময়কাল কে নব্য-প্রস্তর যুগ বলা হয়।

আফ্রিকা মহাদেশে মানব প্রজাতির উৎপত্তির হলেও আনুমান করা হয়, হীম যুগের শেষের দিকে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে। তাদেরই একটা দল, আধুনা ইরান – আফগানিস্থান হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ভারতীয় ভূখণ্ডে এসে পৌঁছয়। সেখান থেকে একদল আরও পূর্ব দিকে চলে যায়, একদল দক্ষিণের দিকে চলে যায়, এবং একদল উত্তর পশ্চিম দিকেই বসবাস শুরু করে। প্লেইস্টোসিন যুগের শেষ সময়ে তাঁরা এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে, তাই মূল ভারতীয় হওয়ার শিরোপা এঁদেরই প্রাপ্য।

ভারতীয় ভূখণ্ডে, বিশেষত বাংলাদেশে, প্লেইস্টোসিন যুগের কোনও আদি-মানুষের পূর্ণাবয়ব কঙ্কাল খুঁজে না পাওয়া গেলেও, আধুনা চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল থেকে শুরু করে হুগলী, বর্ধমান, রানিগঞ্জ, সীতারামপুর হয়ে ঝাড়খণ্ডের ঝড়িয়া কয়লাখনি অবধি বিস্তৃত ভূখণ্ডের বিভিন্ন জায়গায় প্রস্তর যুগীয় বহু পাষাণ আয়ুধ খুঁজে পাওয়া গেছে। হিমালয়ের তরাই অঞ্চলে প্রস্তর যুগীয় অস্ত্রের খোঁজ এখনও না মিললেও, দক্ষিণে মেদিনীপুর-বাঁকুড়া-পুরুলিয়া, ঝাড়খণ্ডের চাঁইবাসা-চক্রধরপুর অথবা উড়িষ্যার তালসারি-ঢেঙ্কেনাল-সম্বলপুর-অঙ্গুল অবধি বিস্তৃত অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় প্রস্তর যুগের বহু অস্ত্র খুঁজে পাওয়া গেছে। পূর্বভারতীয় ভূখণ্ডে খুঁজে পাওয়া প্রস্তর-যুগীয় অস্ত্রের সঙ্গে, দক্ষিন ভারতে খুঁজে পাওয়া প্রস্তর-যুগীয় অস্ত্রের গঠনগত সাযুজ্য থাকলেও, ভারতীয় ভূখণ্ডের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে খুঁজে পাওয়া প্রস্তর-যুগীয় অস্ত্রের সঙ্গে আকার এবং তীক্ষ্ণতায় মৌলিক ফরাক রয়েছে। পূর্ব এবং দক্ষিণভারতীয় ভূখণ্ডে যেমন কুঠার জাতীয় অস্ত্রের আধিক্য বেশি, তেমনই উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে বর্শা-ফলা, তির জাতীয় অস্ত্রের প্রাধান্য লক্ষণীয়। এখান থেকে দুটো ধারনা অনুমান করা যায়- এক, পূর্বে চট্টগ্রাম থেকে পশ্চিমে ধানবাদ এবং উত্তরে বর্ধমান থেকে দক্ষিনে অঙ্গুল অবধি বিস্তৃত এলাকায় প্লেইস্টোসিন যুগে আদি-মানুষদের বাসস্থান ছিল; দুই, দক্ষিনভারতীয় আদি-মানুষদের সঙ্গে পূর্বভারতীয় আদি-মানুষদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

অস্ত্রের গঠনে মৌলিক তফাত আরেকটা ধারনারও জন্ম দেয় যে মানব সভ্যতার ইতিহাসে পূর্বভারতীয় ভূখণ্ডের মানুষেরা তাদের উত্তরপশ্চিম ভারতীয় স্বজাতিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, এক স্বকীয় সভ্যতার সৃষ্টি করেছিল।

তামাটে বাঙালী

পাণ্ডুরাজার ঢিবি [পশ্চিম বর্ধমান জেলায়, আউসগ্রাম থানা অন্তর্গত, অজয়নদের তীরে (বোলপুর শান্তিনিকেতনের কাছে)]
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া

পূর্বভারতীয় ভূখণ্ডের বৈশিষ্ট হল এখানকার উর্বর মাটি এবং নদী-নালার বিস্তার। এই দুটো বৈশিষ্টের জন্য এখানে বসবাসকারী আদি-মানুষেরা অন্যান্য জায়গার তুলনায় অনেক আগেই নিজেদের যাযাবর জীবন ত্যাগ করে কৃষিকে জীবিকা হিসেবে গ্রহন করে। সেই অর্থে দেখতে গেলে, “কৃষি বাঙালীর ভিত্তি” এই কথাটা এতটুকুও অত্যুক্তি নয়।

আবহাওয়া এবং মাটির গুনে সমৃদ্ধ পূর্বভারতীয় ভূখণ্ড, আমাদের পূর্বপুরুষদের শুধু্মাত্র কৃষি এবং কৃষি ভিত্তিক কাজকর্মেই উৎসাহিত করেনি, বরং আমাদের সংস্কৃতি এবং ধর্মবিশ্বাসেও তার গভীর ছাপ রেখে দেয়। আধুনিক বাঙালী জীবনে এখনও এমন অনেক লোকাচার প্রচলিত রয়েছে, যার সুত্রপাত নবোপলীয় যুগেই ঘটেছিল।

নবোপলীয় যুগে বাঙালী কৃষি ছাড়াও পশুপালনকে গুরুত্ব দিয়েছিল। এই দুইয়ের মিশেলে আদিম বাঙালী জীবনে যে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে, তা হল বাঙালী সমাজে পরিবার এবং গ্রাম্যজীবনের একটা পরিভাষা তৈরি হয়। তাঁরা শিকারের হিংসা ছেড়ে বুন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে জীবনযাপন করতে শুরু করে। বাঙালীর জীবনে আত্মীয়তার সুত্রপাত এইসময় থেকেই শুরু হয়। নবোপলীয় যুগের সৃষ্টির নিদর্শন উত্তরে দার্জিলিং থেকে দক্ষিনে উড়িষ্যার অঙ্গুল পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। অতএব, এটা সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায়, নবোপলীয় যুগে আদিম-বাঙালী এই গোটা এলাকাজুড়ে বসবাস করত।

নিজেদের জীবনযাপনকে আরও নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দে ভরপুর করতেই মানুষ প্রত্ন-প্রস্তরযুগ থেকে নবোপলীয় যুগে উন্নীত হয়েছিল। মানুষের সেই অদম্য ইচ্ছা এবং পরিশ্রমের ফলে, মাত্র ৫ হাজার বছরের মধ্যেই নবোপলীয় যুগের অবসান ঘটে। এরপর শুরু হয়, তাম্রযুগের নগর সভ্যতা, অর্থাৎ যখন মানুষ ধাতুর ব্যবহার করতে শুরু করে।

পৃথিবীতে তাম্রযুগের নগর সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলেই সাধারণত সিন্ধু সভ্যতা, সুমেরু সভ্যতা, অথবা মিশরীয় সভ্যতা নিয়ে আলোচনা হয়, অথচ, ঠিক একই সময়ে বাঙলার এই মাটিতেও তাম্রযুগীর নগর সভ্যতার উদ্ভাবন হয়েছিল, সে বিষয়ে অনেকেই জানে না।

তাম্রযুগের নগর সভ্যতার মূলে ছিল তামা’র ভূমিকা। ভারতীয় ভূখণ্ডে এই সভ্যতার বিস্তার ঘটার পেছনেও এই একই কারণ ছিল, এবং সেই সময়ে বাঙলার মাটিতে তামার পরিমাণ অন্যান্য জায়গার তুলনায় বেশি পাওয়া যেত বলেই এখানে এই সভ্যতার উন্মেষণ তাড়াতাড়ি ঘটেছিল।

বাঙলাদেশে তাম্রযুগীয় নগর সভ্যতার নিদর্শন, আধুনা পশ্চিম বর্ধমান জেলায়, আউসগ্রাম থানা অন্তর্গত, অজয়নদের তীরে পাণ্ডুরাজার ঢিবি (বোলপুর শান্তিনিকেতনের কাছে)-তে পাওয়া গেছে। ১৯৬২ থেকে ১৯৮৫ অব্দি তিন-ধাপে এখানে খননকার্য চালানো হয় এবং অনার্য- বাঙালী ইতিহাসের একটা আদিম অধ্যায়ের খোঁজ পাওয়া যায়। তারপর কোনও অজানা কারণেই এই খোঁজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাঙলা এবং বাঙালীর ইতিহাসের প্রতি এমন ঔদাসিন্যের একটা বা অনেকগুলো কারণ হতে পারে, যার কিছুটা আভাস আমার এই লেখার পরবর্তী কিস্তিতে পাওয়া গেলেও যেতে পারে।

পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে একসঙ্গে চারটে বিভিন্ন যুগের সভ্যতার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। অনুমান করা হয়, এখানে মানুষের বসবাস শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে, অর্থাৎ সেই প্রাচীন নবোপলীয় যুগ থেকে। সেই যুগের লোকরা কাঁকরপেটা বা মোরাম দিয়ে বাড়ী তৈরি করত। রান্না এবং খাওয়া-দাওয়ার জন্যে মাটির বাসনকোসন তৈরি করত। তাঁরা মূলত ধান চাষ করত। তারপর পাণ্ডুরাজার ঢিবি এক ভয়ঙ্কর বন্যায় ডুবে যায় এবং তখনকার মানুষজনেরা সাময়িকভাবে এই জায়গা থেকে সরে যায়। তারপর, জল নেমে গেলে, তাঁরা আবার ফিরে এসে নবোদ্যমে বসবাস শুরু করে। এই যুগের লোকরাই বাংলাদেশে তাম্র-যুগীয় সভ্যতার সূচনা করে । তাঁরা পরিকল্পিত ভাবে নিজেদের থাকার উপযুক্ত শহর, জল-নিকাশি প্রনালী, এবং রাস্তাঘাট তৈরি করে। নিজেদের নিরাপদে রাখতে তাঁরা দুর্গও তৈরি করে।

এই সময়ের লোকেরা তামার ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল। কৃষি ও বাণিজ্য তাঁদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল। এই যুগের লোকেরা ধান ছাড়াও অন্যান্য শস্য উৎপাদন করতে শুরু করেছিল। তাঁদের মধ্যে পশুপালন এবং কর্মকারের কাজও প্রচলিত ছিল। এই সময়ের লোকেরা মৃতদেহ সৎকারে সেগুলোকে পুব-পশ্চিম দিকে শুইয়ে সমাধিস্থ করত (পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে খননকার্য চালিয়ে সাতজন পূর্ণাবয়ব মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেছে যা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার জিম্মায় রয়েছে)। তাঁরা শিব ও শক্তি-বন্দনায় মাতৃপূজোয় বিশ্বাস করত। প্রমান স্বরূপ মনে করিয়ে দিতে চাই, গোটা বাংলাদেশ জুড়ে যত শিব এবং কালী মন্দির আছে, তা ভূভারতে আর কোথাও নেই। এই বিষয়ে পরবর্তী কোন এক কিস্তিতে বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছে রইল।

পাণ্ডুরাজার ঢিবির দ্বিতীয় যুগটাই ছিল সবচেয়ে গৌরবময় ও সমৃদ্ধিশালী যুগ। এই যুগের মূল অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ছিল তামা উৎপাদন এবং বিক্রি। তাঁরা নিজেদের ব্যাবসা জাল ভারতীয় ভূখণ্ড ছাড়াও, ‘সাত সমুদ্দুর, তের নদী’ পার করে বিদেশেও ছড়িয়ে দিয়েছিল। গ্রীসের ক্রীটদ্বীপ এবং ভূমধ্যসাগরীয় অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সবচেয়ে বেশী ব্যাবসায়িক সম্পর্ক ছিল। প্রমান হিসেবে ক্রীটদ্বীপে তখনকার প্রচলিত ভাষায় লেখা কিছু গোল-সীলমোহর পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে পাওয়া গিয়েছে। তাঁরা ব্যাবসার পণ্য হিসেবে তামা ছাড়াও, মসলা, তুলো, কাপড়, হাতির দাঁত, সোনা, রুপো এবং সম্ভবত হীরেও বিক্রি করত। পরে এই পন্যসম্ভারে গুড় এবং চিনিও ঢুকে পরে, কারণ পরবর্তীকালের ইতিহাস থেকে জানা যায় রোমসাম্রাজ্যে বাঙলার গুড় এবং চিনির বিশেষ চাহিদা ছিল।

এই তথ্য থেকে একটা কথা প্রমানিত হয়, ব্যাবসা-বাণিজ্য বাঙালীর রক্তে আদিমকাল থেকেই আছে। অতএব, ‘বাঙালী বাণিজ্য বিমুখ’ অথবা ‘বাঙালী ব্যাবসা করতে পারে না’, এই কথাগুলো দুর্মুখের ভাষণ এবং বাঙালী জাতিকে অপমান করার জন্যেই বলা হয়। বাঙালীর বাণিজ্য প্রবণতার পক্ষে আরও কিছু তথ্য আমার আগামী কিস্তিগুলোয় পাওয়া যাবে।

তাম্র-যুগীয় সভ্যতার অভ্যুদয়ে তামার ভূমিকাই প্রধান ছিল। তাই এই সভ্যতার উন্নতি এমন জায়গাতেই হয়েছে যেখানে প্রচুর পরিমাণে তামা পাওয়া যেত। মিশর থেকে সিন্ধু অঞ্চলের অনেক জায়গাতেই তামা পাওয়া গেলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় কম। সেইসময় ভারতীয় ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় তামার খনি ছিল বাঙলার (আধুনা, ঝাড়খণ্ডের সিংভুম জেলার) ধলভূমগড়ে। সেখান থেকে তামা তুলে এনে বাঙলার সবচেয়ে বড় বন্দর তাম্রলিপ্ত বা তাম্রলিপ্তি (আধুনা, তমলুক) হয়ে, সেগুলো ‘সাত সমুদ্র তের নদী পার’ হয়ে বিক্রির জন্যে চলে যেত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিক্রয়কেন্দ্রে। এই বন্দরের নামকরণের পেছনেও যে তামার অবদান ছিল, সেকথা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।

এখানে আরেকটা কথা মনে করিয়ে দিলে আমাদের কাছে নিজেদের ইতিহাসের পরিচয়টা আরও স্পষ্ট হবে, যে আধুনিক বাঙালী এখনও নিজেদের ঠাকুরঘরে এবং পুজোআচ্ছায় যে পাথর এবং তামার বাসনকোসন, তামার কোশাকুশি ব্যবহার করে, সেটাও আমাদের তাম্র-যুগীয় সভ্যতার নিদর্শন বহন করে।

নবোপলীয় যুগের গ্রামীণ সভ্যতাই পরবর্তীতে তাম্র-যুগের নগরসভ্যতায় উন্নীত হয়েছিল। যেহেতু তামার সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার তখন বাঙলাদেশেই ছিল, তাই আমরা বলতেই পারি, এই বিবর্তন সর্বপ্রথম বাঙলাদেশেই ঘটেছিল। তারপর বাঙলার ব্যাবসায়ীদের হাত ধরে এই সভ্যতা পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় পৌঁচেছিল।

মেদিনীপুরের আদি-বাসিন্দারা যে সামুদ্রিক ব্যাবসায় বেশ পারদর্শী ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ঘাটালের কাছে পান্না গ্রামে মাটি খুঁড়ে পাওয়া ৪৫ ফুট লম্বা একটা সমুদ্রগ্রামী নৌকার কঙ্কালাবশেষ থেকে। এছাড়াও আধুনা তমলুক, তিলদা (তমলুক), রঘুনাথপুর (তমলুক), বাহিরি (কাঁথি), বেড়াচাঁপা (উত্তর ২৪ পরগনা), আটঘরা (উত্তর ২৪ পরগনা), হরিহরপুর (দক্ষিন ২৪ পরগনা), মল্লিকপুর (দক্ষিন ২৪ পরগনা), হরিনারায়ণপুর (ডায়মন্ড হারবার, দক্ষিন ২৪ পরগনা)-র মত নানান জায়গায় পাওয়া প্রাচীন শিলমোহর, পাথর এবং তামার বাসনপত্র, মুদ্রা, এবং বিভিন্ন শস্যের জীবাশ্ম থেকে এবিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় যে সুদূর অতীতে গোটা বাংলাদেশ জুড়ে এক সমৃদ্ধিশালী তাম্র-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, যারা কৃষি এবং পশুপালন ছাড়াও তামা উৎপাদন এবং সামুদ্রিক ব্যাবসায় পারঙ্গত ছিলেন।

আজও যদি আমরা হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, লোথাল, অথবা কালিবঙ্গান সভ্যতার মত পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে খননকার্য চালাই, তা হলে নিশ্চয়ই জানা যাবে যে, তাম্র-যুগীয় সভ্যতার উৎপত্তি বাঙলাদেশেই ঘটেছিল ও বাঙলাই এই সভ্যতার জন্মভূমি ছিল।

পাণ্ডুরাজার ঢিবি

পাণ্ডুরাজার ঢিবি থেকে পাওয়া এক নারীমূর্তি
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া

পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে একসঙ্গে চারটে বিভিন্ন যুগের সভ্যতার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতার মধ্যে ব্যাতিক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ। অনুমানিক প্রায় ৫ হাজার বছর আগে, অজয় নদ, কুন্নুর এবং কোপাই নদীর কাছে পাণ্ডুরাজার ঢিবির প্রথম যুগের সূচনা হয়। এইসময়ের মানুষেরা মূলতঃ ধান চাষ এবং গৃহপালিত পশুপালনকেই নিজেদের জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছিল। তখনই বাঙলার প্রাচীন পল্লীসমাজের গোঁড়াপত্তন হয়। শুকনো ডালপালায় মাটির প্রলেপ দিয়ে নিজেদের বাসস্থান তৈরি করা এঁরা রপ্ত করে ফেলেছিল। বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের জন্যে এঁরা বলদকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করত। সেই সময়ের কিছু পোড়ামাটির ওপর আঁকা ছবি অথবা আমাদের ধর্মীয় আচারে শিবের বাহন হিসেবে বলদের পুজো, এই নিয়মেরই প্রমান।

সেইসময়ের ধর্মীয় আচারে, গোষ্ঠীপতিকে তাঁর বুদ্ধি এবং শৌর্যের জন্যে শিব এবং নতুন প্রাণের জন্মদাত্রী হিসেবে মাতৃদেবীকে শক্তির প্রতিমূর্তি হিসেবে সম্মান করা হত। এঁরা নিজেদের গোষ্ঠীতে কারও মৃত্যুর পর তাঁদের মৃতদেহকে পূর্বদিকে মাথা করে, মাটিতে পুঁতে দিয়ে, তার মাথার কাছে একটা পাথর আড়াআড়ি গেঁথে দিত। বাংলাদেশে আর্যসংস্কৃতির অনুপ্রবেশের আগে মৃতদেহ সৎকারের এই অনার্য রীতিই প্রচলিত ছিল। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, তাঁদের শিব একদিন আবার ফিরে আসবে এবং নিজের সমাধিতে পোঁতা পাথর চিনে, নিজের ছেড়ে যাওয়া শরীর আবার ধারন করবে। আশ্চর্যভাবে এই চিন্তাধারার সঙ্গে প্রাচীন মিশরের মমির ধারনার অদ্ভুত এক মিল পাওয়া যায়।

সময়ের প্রবাহে, গোষ্ঠীপতিদের সমাধিতে পোঁতা এই পাথরগুলোকেই তাঁরা শিবলিঙ্গ হিসেবে পুজো করতে শুরু করে, এবং সেই গোষ্ঠীপতিদের নামেই একেকটা শিবলিঙ্গের একেকটা নাম দেয়। সমগ্র বাঙলাদেশ জুড়ে নানা নামের শিবালয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে এই ছোট্ট বিশ্বাস। বাঙালীর ধর্মীয় কাহীনিতে পল্লিজীবনের ছাপও এই সময়ের সমাজজীবনের ছায়া থেকেই এসেছে। (বাঙালীর ধর্মীয় ইতিহাসের আলোচনা আমি আলাদাভাবে করব)

এই সময়েই বাঙ্গালীর আধুনিক পরিধানের সূত্রপাতও ঘটে। আমাদের জীবনধারণের পাঁচটা মৌলিক চাহিদার দ্বিতীয় চাহিদাটাই হল, বস্ত্র অথবা পোশাক। পোশাক-পরিচ্ছদ মানব সভ্যতার ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জেনেটিক স্কিন-কালারেশন গবেষণায় জানা গেছে, আনুমানিক ১০ লক্ষ বছর আগে, মানব প্রজাতির শরীর থেকে অপ্রয়োজনীয় লোম হারিয়ে যেতে শুরু করে। তারপর প্রায় ৭২ হাজার বছর আগে মানব প্রজাতি, সম্ভবত নিজেদের শরীরকে গ্রীষ্ম, বর্ষা অথবা শীতের মত প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে রক্ষা করার জন্যই গাছের পাতা, বাকল বা পশুর চামড়াকে পরিচ্ছদ হিসেবে ব্যাবহার করতে শুরু করে।

পুরা-প্রস্তরযুগে পূর্বভারতীয় ভূখণ্ডে অখণ্ড কাপড় পরার প্রচলন ছিল। মুলতঃ গাছের পাতা বা বাকল দিয়ে (বাকলগুলোকে মুলতঃ পাথর দিয়ে পিটিয়ে নরম এবং পাতলা করা হত) তৈরি সরু কাপড়গুলোকে ‘দুকুল’ এবং চওড়া কাপড়গুলোকে ‘ক্ষৌম’ বলা হত। অনুষ্ঠান বিশেষে পুরুষেরা নিজেদের নিম্নাঙ্গে এবং নারীরা নিজেদের বক্ষদেশে, কাঁচুলির মত ‘দুকুল’ পরলেও, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই নিজেদের শরীরের নিম্নাংশের আচ্ছাদন হিসেবে ‘ক্ষৌম’ পরত। এখনও হিন্দুমতে বিশ্বাসী বাঙালীদের মধ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ক্ষৌমবস্ত্র পরে বসার বিধান মানা হয়।

পাণ্ডুরাজার ঢিবির প্রথম যুগে পোশাক হিসেবে গাছের বাকলের বদলে শণ, পাট, ধঞ্চে, অথবা আতসীগাছের বাকল থেকে রেশা ছাড়িয়ে, সম্ভবত হাত দিয়ে বুনে, কাপড় তৈরি করা শুরু হয়। পাণ্ডুরাজার ঢিবি থেকে প্রাচীন এইরকম অখণ্ড টেক্সটাইলের কিছু নমুনাও পাওয়া গেছে। (বাঙালীর পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস নিয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করব)

এক ভয়ঙ্কর বন্যার ফলে গোটা পাণ্ডুরাজার ঢিবি নদীর জলে তলিয়ে যায় এবং পাণ্ডুরাজার ঢিবির প্রথম যুগের অবসান ঘটে। আন্দাজ করা হয়, যারা বেঁচে গেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কিছু গোষ্ঠী সেই সময় দক্ষিণ-পশ্চিমে আধুনা মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া অঞ্চলে নিজেদের বাসস্থান সরিয়ে নিয়ে যায়।

কিছু গোষ্ঠী উত্তরদিকে সরে যায় এবং একসময় জল নেমে গেলে ফিরে এসে, বাংলাদেশে তাম্র-যুগীয় সভ্যতার সূচনা করে। এটাকেই পাণ্ডুরাজার ঢিবির দ্বিতীয় যুগ বলা হয়।

পাণ্ডুরাজার ঢিবির দ্বিতীয় যুগে কৃষি এবং পশুপালন ছাড়াও, ব্যাবসাবৃত্তি এবং নান্দনিক সংস্কৃতির উন্মেষ হয়েছিল। তাঁদের ধর্মীয় আচারে সূর্যগ্রহন, চন্দ্রগ্রহন, খরা, বন্যা ইত্যাদি নানান প্রাকৃতিক ঘটনা যথেষ্ট গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এইসময়েই শক্তিপুজো হিসেবে বাংলাদেশে তন্ত্রসাধনার প্রারম্ভিক সূচনা হয়, যা বৌদ্ধযুগে তার চরম সীমায় পৌঁছয়। সেইসময়ে তৈরি পোড়ামাটি অথবা তামার তৈরি বাসনপত্র, ফলক এবং অন্যান্য জিনিষপত্রের ওপর তৈরি নক্সা এবং খোদাইচিত্র থেকে সেইসময়ের সামাজিক রীতি এবং সংস্কৃতিতে এমনই প্রমান পাওয়া যায়। পরবর্তীতে আর্যসংস্কৃতির ছোঁয়ায় এই সংস্কৃতির প্রতিস্ফুরন ঘটে।

কাপাসের তুলো দিয়ে কাপড়ের সুতো এবং বুননের জন্যে তাঁতযন্ত্রের আবিষ্কারও এইসময়েই ঘটে। এইসময়েই রেশমকীট পালন এবং সেখান থেকে মসলিনের কাপড় তৈরিও শুরু হয়েছিল। অনুমান করা হয়, এই যুগ থেকেই বাঙালী পুরুষদের ধুতি এবং মহিলাদের শাড়ি পরার চলন শুরু হয়। এইসময় সাধারণত সবার শরীরের ঊর্ধ্বাংশ অনাবৃতই থাকত, তবে আভিজাত নারী এবং পুরুষেরা নিজেদের উর্ধ্বাঙ্গে ধাতু এবং হাড়ের তৈরি অলংকার পরতেন।

অভিজাত পুরুষেরা হাঁটুর নীচ অব্দি ধুতি পরলেও, সাধারণ পুরুষদের ধুতিতে হাঁটুর উপর পর্যন্ত ঢাকা পড়ত। তাঁরা নিজেদের ধুতির মাঝখানটা কোমরে জড়িয়ে দুই দিক টেনে কাছা দিত, অনেকটা আজকাল কোমরে যেভাবে গামছা পরে সেইরকম। সাধারণ নারীদের পরিধান শাড়িতে তাঁদের পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা থাকত। তাঁরা কোমরে কাছা দিত না, তবে এক বা একাধিক প্যাঁচে কাপড়টা কোমরে গুঁজে পরত।

কারবন-১৪ ডেটিঙের মাধম্যে অনুমান করা হয়, পাণ্ডুরাজার ঢিবির দ্বিতীয় যুগের আয়ু ছিল প্রায় ১০২০ (+/- ১২০ বছর) বছর। তারপর এক ভয়ঙ্কর আগুনে গোটা জায়গাটা পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

আনুমানিক ৩০০০ বছর আগে পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে তৃতীয় যুগের সূচনা হয়। এইযুগকে আমরা মহাভারতীর যুগের সমকক্ষও বলতে পারি। এই যুগে পোড়ামাটি এবং তামার ব্যবহার ছাড়াও লোহার ব্যবহার বিশেষ ভাবে পরিলক্ষিত হয়। সেইসময়ের তৈরি লোহার অস্ত্রশস্ত্র এবং ঢালাইয়ের যন্ত্রপাতির হদিশ, তেমনই সাক্ষ বয়ে বেড়াচ্ছে। পাণ্ডুরাজার ঢিবির তৃতীয় যুগের অবসানও অগ্নিকান্ডেই ঘটে।

পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে চতুর্থ যুগের সূচনা মৌর্যযুগে হয় এবং মৌর্যযুগের অবসানের সঙ্গেই পাণ্ডুরাজার ঢিবির ইতিহাস কালের কবলে হারিয়ে যায়।

বাঙলার ইতিহাসে পাণ্ডুরাজার ঢিবি শুধু বাঙালী সভ্যতাকেই এগিয়ে নিয়ে যায়নি, বাঙালীজাতির ইতিহাসও এখান থেকেই শুরু হয়েছিল।

(ক্রমশঃ)

রেফারেন্সঃ

  1. বাঙ্গালার ইতিহাস [শ্রী রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়]
  2. বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন [ডঃ অতুল সুর]
  3. প্রাচীন বাংলার ইতিহাস [শ্রী অমিতাভ ভট্টাচার্য]
  4. বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) [শ্রী নীহাররঞ্জন রায়]
  5. বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত [ডঃ আসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়]
  6. তন্ত্রে তত্ত্ব ও সাধনা [স্বামী পজ্ঞানানন্দ]