বর্তমান সময়ে ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট নিয়ে কিছু কথা

Pic Courtesy: HUMAN FLOW (Germany, 2017) A documentary by Ai Weiwei

ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সিনেমা নির্মাণের প্রক্রিয়াকে অনেক সহজলব্ধ এবং সাশ্রয়ী করে দিয়েছে। যার ফলে আজকাল প্রচুর স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা তৈরি হচ্ছে। যদিও সেই সিনেমাগুলোর বেশির ভাগই সিনেমার ভাষা, আঙ্গিক কিংবা কন্টেন্টের দিক থেকে ভীষণ দুর্বল। তবে হাতে গোনা কিছু সিনেমা সত্যি সত্যিই ভাল হচ্ছে, যেগুলো সিনেমার ভাষা এবং ভাবনার দিক থেকে যথেষ্ট বলিষ্ঠ। দুর্ভাগ্যবশত এই অল্পসংখ্যক তৈরি সিনেমার বেশিরভাগই দর্শকদের কাছে পৌঁছতে পারে না। হাতে গোনা কয়েকটা সিনেমা কিছু দেশি বিদেশী ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ঘোরা ফেরা করে, কিছু সাম্মানিক যোগাড় করতে পারলেও, বাণিজ্যিক সিনেমার ভীড়ে টিকতে পারে না। যে সিনেমাগুলোকে সত্যি দর্শকদের কাছে পৌঁছনোর প্রয়োজন আছে, অর্থনৈতিক চাপে সেগুলোই হারিয়ে যায়।

অবশ্য অনেকের মতে ‘সিনেমার দিন শেষ, এখন টেলিভিশন এবং ওয়েবসিরিজের যুগ।’ এই ব্যাপারে আমার অবশ্য ভিন্নমত। সিনেমার ‘সিনেম্যাটিক অরা’ শুধুমাত্র সিলভার স্ক্রীনেই পাওয়া যায়, অন্য কোথাও নয়। টেলিভিশন অথবা ওয়েবসিরিজ, সিনেমাকে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আরেকটা মাধ্যম হতেই পারে, কিন্তু সিলভার স্ক্রীনের বিকল্প হতে পারে না। কিন্তু সিনেমার অর্থনীতি বলছে বড় পর্দায় সিনেমা বাণিজ্যিক ভাবে সফল হচ্ছে না। আর এখানেই মূল সমস্যাটা আর তার সমাধানটাও লুকিয়ে আছে।

অর্থনীতির ভাষায় যে কোন পণ্যের বিক্রী এবং মুনাফার জন্য একটা বাজার আর উপভোক্তার প্রয়োজন হয়। উপভোক্তারা সেই পণ্য সম্পর্কে জানতে এবং ব্যবহার করতে আগ্রহী হলেই, তবেই সেই পণ্য বিক্রি হয়। বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর নির্মাতারা এই সাধারণ অর্থনৈতিক তত্বের ওপর ভিত্তি করেই নিজেদের বিজ্ঞাপন তৈরি এবং প্রচার করেন। সিনেমার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে। এখানেও আগ্রহী দর্শকরা একদল উপভোক্তা হিসেবেই সিনেমার জন্যে বাণিজ্য এনে দেয়। কিন্তু সিনেমা তৈরীর ক্ষেত্র যেভাবে শর্টকাট ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, এবং একই ধাঁচের একের পর এক একই জিনিস পরিবেশিত হচ্ছে, তাতে বেচারী দর্শকদের মধ্যে সিনেমা সম্পর্কে যে উদাসীনতা অথবা বিতৃষ্ণা জন্ম নিয়েছে, তার ফলই ভোগ করতে হচ্ছে আজকের গোটা সিনেমা শিল্পকে।

আজকাল সিনেমার দর্শকদের সিনেমা হলে টেনে আনার জন্যে একটা গোটা সিনেমা তৈরি করার মতই সময় ও পরিশ্রম করে তার ট্রেলার তৈরি হচ্ছে। মার্কেটিঙের নিয়ম মেনে সেগুলো পরিবেশিত হচ্ছে। অফলাইন আর অনলাইন মিডিয়াতে সেই ট্রেলারগুলো ছড়িয়ে দিয়ে দর্শকদের লালায়িত করার জন্য বিভিন্ন মার্কেটিং গিমিকের সাহায্যও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যেটা নেওয়া হচ্ছে না, তা হল দর্শকদের সিনেমার ব্যাপারে আগ্রহ ও রুচি তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। মার্কেটিঙের ভাষায় বাজারে মী-টু প্রডাক্টের ছড়াছড়ি হয়ে গেলে উপভোক্তাদের আগ্রহ কমে যায়, যা বাজার এবং পন্যের মুনফাকে কমিয়ে দেয়। বর্তমানে সিনেমার ক্ষেত্রেও তাইই হচ্ছে। একই ধরনের প্রোডাক্ট দেখতে দেখতে দর্শক আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, আর তাই সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার দর্শকও কমে যাচ্ছে। দর্শক কমে গেলে, সিনেমা দেখানোর জায়গা, অর্থাৎ স্ক্রিনিং থিয়েটার গুলোও কমে যাচ্ছে। কিছু সিনে মাল্টিপ্লেক্স অবশ্য তৈরী হয়েছে, কিন্তু তারা সিনেমার গুনগত মান থেকে নিজেদের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বেশী মনোনিবেশ করছে। তাদের দিক থেকে তারা ঠিকই করছে, অর্থনীতি সেটাই সমর্থন করে।

তাহলে উপায় কি নেই? সিনেমা কি তাহলে প্রাগৈতিহাসিক হয়ে যাবে? না, এখনই হয়ত সেটা হবে না। তবে এভাবেই চলতে থাকলে একদিন এই শিল্পে দর্শকদের সাথে সাথে নির্মাতাদেরও উৎসাহ কমে যাবে, যেটা সামগ্রিকভাবে সিনেমা শিল্পেরই ক্ষতি।

আসলে এই সময়ের দাবী হচ্ছে সিনেমার জন্য নতুনভাবে দর্শকদের উৎসাহীত করা এবং তাদের মধ্যে সিনেমা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় রুচিবোধ তৈরি করতে সাহায্য করা। অনেকটা একটু আগে যে অর্থনৈতিক সূত্রের কথা বললাম, সেই সূত্রধরে একটা নতুন শ্রেণীর উপভোক্তা তৈরি করা, যারা সিনেমার বাজারকে নতুনভাবে চাঙ্গা করতে সাহায্য করবে। আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে শহুরে এবং গ্রামীণ দর্শকদের মধ্যে যখন রুচির তফাৎ কমে যাচ্ছে, তখন সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে, তাদের সামনে একটু অন্যধারার সিনেমা দেখার সুযোগ করে দিয়ে একটা পরিবর্তন আনা যায়।

বর্তমানে বিভিন্ন ছোট বড় ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, মেট্রো শহরগুলোর বাইরে বেড়িয়ে মাঝারি এবং ছোট শহর কিম্বা গঞ্জে একটু অন্যধারার সিনেমা দেখার সুযোগটা অল্প হলেও তৈরি করার চেষ্টা করছে। এই জায়গা গুলোয় সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের কাছে ভালো সিনেমা সম্পর্কে একটা আগ্রহ তৈরি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই দর্শকদের শিক্ষিত ও আগ্রহী করার কাজে গতি আনার জন্য আমাদের আরেকবার ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টের দিকে ফিরে তাকাতে হবে।

ইতিহাস বলে, বিশ্বের প্রথম ফিল্ম সোসাইটি ১৯২০ সালে ফ্রান্সে তৈরি হয়, অর্থাৎ ১৮৯৫ সালে ল্যুমিয়ার ব্রাদার্সদের মুভিং ইমেজ দেখানোর পঁচিশ বছর পরেই। যদিও ফ্রান্সে ওটাকে সিনে ক্লাব বলা হত। ১৯২০ থেকে ১৯২৫, এই পাঁচ বছরে শুধুমাত্র ফ্রান্সেই প্রায় ২০ খানা নতুন সিনে ক্লাব তৈরি হয়ে যায়। তবে ‘ফিল্ম সোসাইটি’ বলে প্রথম যে সংস্থা নিজেদের রেজিস্টার্ড করে, সেটা ছিল ‘দ্য ফিল্ম সোসাইটি অফ লন্ডন’। ১৯২৫ সালে  H.G. Wells, George Bernard Shaw, Augustus John, John Maynard Keyne প্রমুখরা মিলে সেটা শুরু করেছিলেন। লন্ডনে এই ফিল্ম সোসাইটি তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল ওখানকার দর্শকদের জন্যে তখনকার ব্রিটেনে স্টুডিও ঘরানার বাইরে তৈরি ফ্রেঞ্চ, সোভিয়েত, এবং জার্মান সিনেমাগুলো দেখার সুযোগ পাইয়ে দেওয়া, যা সেইসময় লন্ডনের সাধারণ দর্শকদের পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ একটা চলতি ঘরানার বাইরে বেরিয়ে অন্য ধারার খোঁজ করার চেষ্টা দিয়েই ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট তার পথ চলা শুরু করেছিল।

আমাদের দেশে ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট শুরু হয় ১৯৩৭ সালে। সেইসময়ের বোম্বে শহরের কয়েকজন তথ্যচিত্র নির্মাতা এবং ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি’ পত্রিকার কয়েকজন ফিল্ম ক্রিটিক মিলে বিদেশী সিনেমা দেখার জন্যে শুরু করেন ‘অ্যামেচার ফিল্ম সোসাইটি’ এবং ‘বম্বে ফিল্ম সোসাইটি’। যদিও এই দুই ফিল্ম সোসাইটিই তেমনভাবে সফল হতে পারেনি। ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টকে ত্বরান্বিত করে ১৯৪৭ সালে তৈরি হওয়া ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’। ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি-র গোড়াপত্তনের পর ‘পাটনা ফিল্ম সোসাইটি’, ‘দিল্লী ফিল্ম সোসাইটি’, মাদ্রাস ফিল্ম সোসাইটি, ভারতবর্ষে একের পর এক ফিল্ম সোসাইটি তৈরি হতে থাকে। এই ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট এতটাই সফল হয় যার ফলে কেন্দ্রীয় সরকারকে ১৯৫৯ সালে বাধ্য হয়েই ‘ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’ তৈরি করে দিতে হয়, এবং এরপর বাকিটা ইতিহাস।

এই ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টের দৌলতে আমরা শুধুমাত্র কিছু অবিস্মরণীয় ভালো সিনেমা কিম্বা কিম্বাদন্তি চিত্র-পরিচালকদেরই পাইনি; সিনেমাকে যে সামাজিক চেতনা এবং আন্দোলনের একটা বড় অংশ এবং হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সেই ব্যাপারেও শিক্ষিত হয়ে সিনেমাকে আমাদের হাতিয়ার হিসেবে সফলভাবে ব্যবহার করতেও পেরেছি। দুর্ভাগ্যবশত, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে এই ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টের গতিপ্রকৃতিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেই, আজ এই শক্তিশালী মাধ্যমটা ঝিমিয়ে পড়েছে। কিছু হাতে গোনা ফিল্ম সোসাইটি আজও অবশ্য তাদের অবদান রেখে চলেছে। ‘ফেডারেশনের অফ ফিল্ম সোসাইটিজ অফ ইন্ডিয়া’-ও আজ তাদের কর্মপদ্ধতিতে অনেক বদল নিয়ে এসেছে এবং নতুন ভাবে ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

সময়ের সাথে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্যে বিভিন্ন দেশীয় সিনেমা দেখা একসময় সহজলভ্য হয়ে যায়। এছাড়া সিনেমা মাধ্যমের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শক্তিকে বুঝতে পেরে বিভিন্ন কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে সিনেমা সংক্রান্ত পড়াশোনা শুরু হয়ে যায়। এর ফলে ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট ঝিমিয়ে পরে। সাধারণ দর্শকদের মধ্যে ফিল্ম সোসাইটি নিয়ে আগ্রহও কমে যায়। বানিজ্যিক সিনেমার রমরমাও এই কাজে অনেকটাই সাহায্য করে। কিন্তু কলেজ আর ইউনিভার্সিটিতে সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা করিয়ে সিনেমা নির্মাণের করার জন্য শিল্পী এবং ক্রু তৈরি হলেও, দর্শকদের রুচিবোধ ও আগ্রহ তৈরি করার ব্যাপারে কেউই চিন্তা করেননি। আর এইজন্যেই সিনেমা আর সিনেমার দর্শকদের মধ্যে একটা বিশাল দুরত্ব তৈরি হয়ে যায়। এই ফাঁক ভরাট করার দায়িত্বটাও ফিল্ম সোসাইটি কাজের মধ্যে পরে।

এই সময়ে যদি আরেকবার, আজকের নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গে করে, সিনেমা নির্মাতা এবং বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটিগুলো নতুন ভাবে দর্শকদের সিনেমা সম্পর্কে শিক্ষিত করতে, তাদের সামনে বাজারচলতি সিনেমার বাইরে তৈরি একদম নতুন স্বাদের ও নতুন ভাবনার সিনেমা দেখার সুযোগ করে দিতে পারে, তাহলেই একটা নতুন প্রজন্মের উপভোক্তা তৈরি হবে। তারাই তখন এই অল্প প্রদর্শিত অন্য ঘরানার সিনেমার জন্যে একটা নতুন বাজার তৈরী করে দেবে, যা সামগ্রিকভাবে সিনেমা শিল্প, বাজার এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রফল কে কয়েকগুণ প্রশস্ত করে দেবে।

এর জন্যে দরকার শুধু একটা সদিচ্ছা এবং একনিষ্ঠভাবে ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টকে বর্তমান প্রজন্মের মত করে নেক্সট লেভেলে নিয়ে যাওয়া। এই দীর্ঘমেয়াদি কাজে অবশ্যই কায়িক পরিশ্রমের সাথে সাথে অর্থনৈতিক সাহায্যের দরকার লাগবেই। সেটা যে কোনও উদ্যোগের জন্যেই লেগে থাকে। তবে উদ্যেশ্য যদি সৎ হয়, তাহলে সাহায্য এবং সম্ভবনা দুইই পাওয়া যায়। এটা আশার আলো।